রাজ- আমার মত একজন বিপত্নীক মানুষকে কেন আপনি বিয়ে করলেন অদ্রিজা? আপনি তো আনমেরিড কাউকে বিয়ে করতে পারতেন? কেন নিজেকে আমার অভিশপ্ত জীবনের সাথে জড়ালেন? আপনি কি আমায় করুণা করছেন?

অদ্রিজা– দেখুন রাজ বিয়েটা আমি আপনাকে দেখে বা আপনাকে করুণা দেখিয়ে করিনি। আপনার অসুস্থ বাবার জন্য আমি করেছি। ছোটবেলায় নিজের বাবাকে হারিয়েছি। আর বছরখানেক আগে নিজের মাকে। বলতে গেলে নিজেরে সেই হারানো বাবার ভালোবাসাটুকু আমি পেতে চাচ্ছি আমি আপনার বাবার কাছ থেকে। সেখানে আমি কাউকে অ্যালাউ করবো না।
নিজের জীবনের দ্বিতীয় বাসরঘরে স্তব্ধ হয়ে আমি দেখে যাচ্ছি আমার সামনে বসে থাকা মানবীটিকে। অদ্রিজা আমার ওয়াইফ। যার সাথে আজ অনাড়ম্বর ভাবে আমার দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে হয়ে গেলো। কখনো ভাবিনি আমাকে এই পরিস্থিতে আবার পরতে হবে। আমি মা-বাবার একমাত্র সন্তান। আমার মা মারা গেছেন বছর তিনেক। মার হঠাৎ মৃত্যু বাবা মেনে নিতে পারিনি। তাই এক বছরের মাথায় সেও স্টোক করে বিছানায় শয্যাশায়ী। অদ্রিজা আমার ফ্রেন্ড প্লাস কলিগ প্রসুনের কাজিন। অদ্রিজারা তিন ভাই তিন বোন। সে সবার ছোট। মা-বাবা নেই।হঠাৎ কারো স্পর্শে আমি বাস্তবে ফিরে আসলাম।
অদ্রিজা– রাজ কি হয়েছে আপনার? এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে কি ভাবছেন? সেই কখন থেকে আপনাকে ডাকছি আমি।
কথাটি বলে অদ্রিজা মুচকি হাসলো।
রাজ– ন-না কিছুনা। এমনি। কিছুকি বলছিলেন?
অদ্রিজা- বলছিলাম কি, আপনাদের বাসায় কোথায় কি আছে আমাকে কি একটু দেখিয়ে দেবেন? আমি তো কিছু জানিনা। আপনার মা থাকলে তিনি আমাকে দেখিয়ে দিতেন। তিনি যেহেতু নেই তাই আপনাকে সব দেখিয়ে দিতে হবে।
রাজ- উম্মম, আপনাকে কিছু করতে হবে না আজ। আপনি ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ুন। এমনিতে অনেক রাত হয়েগেছে। কাল বুয়া এসে সব ঠিক ঠাক করবে। তখন না হয় দেখে নিবেন?
অদ্রিজা- না সেটি হবে না মশাই। বাসাটা কি আপনার নাকি বুয়ার যে সে আমাকে দেখিয়ে দিবে? এখনি আপনি আমাকে সব দেখিয়ে দিবেন। পুরো বাসার যে কি হাল করে রেখেছেন তা বলার বাইরে। এখন থেকে এই সংসারটা যেহেতু আমার তাই বসে থেকে লাভ কি? নিজের সংসার নিজের তারাতারি গুছিয়ে নেওয়াই ভালো।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি অদ্রিজার দিকে। কি বলছে এই মেয়ে। কেউ কি বলবে মাত্র আজ কয়েক ঘন্টা আগে তার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে আর এখনি কিনা সে নাকি ঘরের সব কাজ করবে। আজব তো।
অদ্রিজা- কি হলো? আবার কোথায় হারিয়ে গেলেন? এই আপনি কি এতো ভাবেন?
আমার ঘোর কেটে গেল এই কথা শুনে।
রাজ- আচ্ছা চলুন। আমি সব দেখিয়ে দিচ্ছি আপনাকে।
এই বলে মুচকি হাসলাম।
তারপর অদ্রিজাকে বাসার সব কিছু দেখালাম। দেখানো শেষ হলে বাবার রুমে আসলাম দেখার জন্য যে বাবার কিছু লাগবে কিনা।বাবার দেহের বাম সাইড প্যরালাইজড হয়ে যাওয়া তে ঠিক মতো কথা বলতে পারেনা। অনেক কষ্টে আর ইশারায় কথা বলে।
রাজের বাবা- কিছু বলবি বাবা?
রাজ- না বাবা। দেখতে আসলাম তোমার কিছু লাগবে কিনা।
রাজের বাবা- বৌমা কোথায়?
রাজ- তোমার বৌমা ঘর বাড়ি পরিষ্কার করতে ব্যস্ত।
রাজের বাবা- সে কিরে!!! মাত্র তো আজকেই বিয়ে হলো তোদের। আর আজকেই সে ঘরের কাজে লেগে গেলো? এটা তুই ঠিক করিস নাই বাবা।
একটু রেগেই বাবা আমাকে ধমক দিলো। বাবার জোরে কথা শুনেই অদ্রিজা বাবার রুমে চলে আসলো।
অদ্রিজা- বাবা কি হলো তোমার? এভাবে জোরে কথা বলছো কেন? জানো না তোমার জোরে কথা বলা বাড়ন?
রাজের বাবা- বৌমা তোমাদের আজকে বিয়ে হলো আর তুমি আজকেই ঘরের কাজ করতে লেগে গেলে কেন? কয়টা দিন যাক? তারপর না হয় নিজের এই সংসারের কাজ নিজেই দেখে শুনে করো।
অদ্রিজা- বাবা আজ যদি তোমার একটা মেয়ে থাকতো তাহলে কি তুমি তাকে তুমি বলে ডাকতে পারতে? তাকে তো আদর করে তোমার ছেলের মতো তুই করে বলতে। তাহলে আমার ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম কেন? আজ থেকে আমিও তোমার মেয়ে। আমাকে তুই করে বলবে। আর যদি তুমি করে কথা বলো তাহলে আমি তোমার সাথে আর কথাই বলবো না। মনে থাকে যেন।
অদ্রিজার কথা শুনে বাবার চোখ দিয়ে জল বেয়ে পরতে শুরু করলো। তাই দেখে অদ্রিজা বাবার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললো,
অদ্রিজা- কি হলো তোমার চোখে জল কেন? আমি যেন তোমার চোখে আর কখনো জল না দেখি।
রাজের বাবা- নারে মা আজ থেকে আমি আর কাঁদবো না। আজ থেকে আমার মেয়ে আমার কাছে আছে না। আমি কি আর কাঁদতে পারি? এই দেখ তোর অসুস্থ বাবাটা কেমন সুস্থ হয়ে গেছে।
এই বলে বাবা একটু হাসার চেষ্টা করলো।
অদ্রিজা আর বাবার এই রকম কথপোকথন দেখে আমি আস্তে করে বের হয়ে আমার রুমের বারান্দায় চলে আসলাম। বারান্দার গ্রিলের ফাক দিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আজ অনেকদিন পর বাবাকে এভাবে প্রান খুলে হাসতে দেখলাম। মার মৃত্যু আর আমার জীবনের এক্সিডেন্টের পর বাবাকে কখনো আর হাসতে দেখিনি। অবশ্য বাবা কেন, আমিও তো প্রান খুলে হাসতে ভুলে গেছি। আচ্ছা অদ্রিজাও তো মেয়ে আর সেও তো মেয়ে ছিলো। তাহলে সে কেন আমার অসুস্থ বাবাকে অদ্রিজার মতো নিজের বাবা হিসাবে কেন মেনে নিতে পারলোনা? কেন নিজের ক্যারিয়ারের জন্যে আমাদের ছেড়ে গেলো? কেন আমাদের বাচ্চাকে মেরে ফেললো?আমার জীবনটা এভাবে ধ্বংস করে দিয়ে সে কি পেলো? এসব ভাবছি আর চোখ দিয়ে অনবরত জল বেঁয়ে যাচ্ছে।
অদ্রিজা- কি ব্যাপার আপনাদের বাবা ছেলের যখন তখন কান্না করার রোগ আছে নাকি? তাহলে তো ভালোই হলো আমার জন্যে। আপনাদের চোখের জলেই আমার ঘরের কাজ হয়ে যাবে। এক্সট্রা করে জলের বিল দিয়ে জল ধরে রাখতে হবে না।
এই বলে অদ্রিজা হাসতে লাগলো।
(চলবে)

Leave a Comment